রামগঞ্জ (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
রামগঞ্জে ১৯টি ইটভাটায় প্রতি বছর ইট তৈরিতে পুড়ছে ১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট মাটি। যার পুরোটাই মাটি আসছে ফসলি জমির টপসয়েল অথবা পুকুর খনন করে। আর এ সব ভাটা স্থাপনে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রায় ১৫০ একর জমি। ফলে অস্বাভাবিকভাবে কমছে কৃষিজমি ও উৎপাদন। এ জন্য কৃষি অফিসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা।
ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৯ ও ২০২৩-অনুযায়ী এবং ভূমি উন্নয়ন (নিয়ন্ত্রণ) ১৯৬২-এর আইন অনুযায়ী, ইটভাটা স্থাপনে ৩ একরের বেশি জমি ব্যবহার করা যাবে না। আবাদি জমিতে কোনো ইটভাটা করা যাবে না। কৃষি জমির টপসয়েল ব্যবহার করা যাবে না। যে কোন ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া করা যাবে না। এমন বিধি বিধান থাকলেও সম্প্রতি ইটভাটাগুলো ঘুরে দেখা যায়, এর কোন বিধি মানছেন না ভাটার মালিকরা ও মাটি ব্যবসায়ীরা। ইটভাটারগুলো গড়ে উঠেছে কৃষি মাঠে আবাদি জমিতে। ইটভাটা স্থাপনে অনুমোদিত জমি ৩ একর হলেও ভাটার মালিকরা দখল করছেন কমপক্ষে ৭-৮ একর করে। সে হিসেবে ইটভাটার নিচে প্রায় ১ হাজার ৫০ একর জমিও চলে গেছে। ভাটার মালিকরা ইট তৈরিতে ব্যবহার করছেন পাশ্ববর্তি কৃষি মাঠের ফসলি জমি টপসয়েল এবং ফসলি জমি ১০-২০ ফুট খনন করে আনা মাটি। দেহলা, সমেষপুর, কেথুড়ি, শৈরশৈই, রাজারামপুর, মধ্যভাদুর কৃষি মাঠে দেখা যায়, ফসলি জমি উপরিস্তর বা টপসয়েল কেটে নিচ্ছে। এ ছাড়াও ১৫-২০ ফুট খনন করা শত শত পুকুর। কৃষি মাঠে দেখা যায় অনেক জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে আছে।
কয়েকজন ইটভাটার মালিক ও ভাটার ম্যানেজার সাথে কথা বলে জানা যায়- ইটের আকার অনুসারে একটি কাঁচা ইট তৈরিতে মাটি লাগে ০.০৮৫ ঘনফুট। বছরের অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিটি ভাটায় কমপক্ষে গড়ে ৮ রাউন্ড ইট পোড়ানো হয়। প্রতি রাউন্ডে ৮-১০ লাখ ইট থাকে। তার হিসেবে মতে, একেকটি ভাটায় বছরে কমপক্ষে ৭০-৮০ লাখ ইট পোড়ানো হয়। তার হিসেবে, রামগঞ্জে ১৯টি ইটভাটায় বছরে ইট উৎপাদন হয় ১৫ কোটি । যার জন্য বছরে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট মাটি প্রয়োজন। এছাড়াও তাদের দেওয়া তথ্য মতে একটি ইটভাটায় ৭-৮ একক জমি ব্যবহার করা হয়। সে হিসেবে ১৯টি ইটভাটার নিচে প্রায় ১ হাজার ৫ শত একর জমি রয়েছে।
স্থানীয় সফি উল্যাহ ভূইয়া নামে একজন সার্ভেয়ার জানান, ১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট মাটির জন্য ১ ফুট গভীরতায় প্রায় ১ শত ৩৯ হেক্টর জমির মাটি কাটতে হয়। রামগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় কৃষি জমির পরিমান ১৬ হাজার ৯শ’ হেক্টর। ২০২৩-২৪ চাষাবাদ হয়েছে ১২ হাজার ৮ শত হেক্টর জমি। ২০২৪-২৫ চাষাবাদ হয়েছে ১১ হাজার ২ শত হেক্টর। বর্তমানে অনাবাদি জমির পরিমান ৭ হাজার ৭ হেক্টর। প্রতি বছর গড়ে অনাবাদি জমি বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রায় ১-২শত হেক্টর জমি। পাশাপাশি প্রতি বছর গড়ে উৎপাদন কমছে ৮ থেকে ১০ হাজার মে. টন ফসল।
আনোয়ার হোসেন নামে একজন কৃষি শিক্ষক জানান, কৃষি জমির উপরের স্তর বা টপসয়েল কেটে নিলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যায়, ফসল উৎপাদনে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকে না, জমি অনুর্বর হয়ে যায়। এতে জমি ফসল উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে পেলে। ফলে ফসল উৎপাদন কমে গিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্য সংকট তৈরি হয়। জমি টপসয়েল একবার কেটে নিলে তা পূরণ হতে কয়েক দশক সময় লেগে যায়। টপ সয়েল জমির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর। উপজেলার ভাদুর ইউনিয়নের সমেষপুর গ্রামের আবু জাফর জানান, তার জমির পাশের জমি থেকে ইটভাটার মালিক ও মাটি ব্যবসায়ীরা ২০ফুট মাটি কেটে নিয়ে যায়, এতে তার জমি পুকুরে ভেঙ্গে যাচ্ছে। ঠিকমত ফসল হয় না, তাই বাধ্য হয়ে নিজের জমির মাটি বিক্রি করতে হয়েছে। এ ভাবে ইটভাটার মালিক ও মাটি ব্যবসায়ীরা জমির মালিকদেরকে বাধ্য করছেন জমি অথবা জমির মাটি বিক্রি করতে। উপজেলার ভাদুর ইউনিয়নের সমেষপুর গ্রামের কৃষক আবদুল মান্নান, সিরাজ মিয়াসহ কয়েকজন কৃষক জানান, তার জমির পাশে ইটের ভাটা। রাত-দিন সেখানে পুড়ছে ইট,উড়ছে কালো ধোঁয়া। এদিকে মাটি কেটে নেওয়া কারনে জমি গুলোতে গর্তের সৃষ্টি হয়ে জলাবদ্ধতায় চাষাবাদ করা যায় না, ঠিক মতো ফসলও হয় না। তাই তারা চাষাবাদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
উপজেলার সিরুন্দি গ্রামের আনোয়ার হোসেন, শাকতলা গ্রামের রেজাউল করিম, কাঞ্চনপুর গ্রামের মাসুদ আলম বলেন, ইটভাটা অনুমোদনে কোনো রকম পরিদর্শন না করেই ছাড়পত্র দিচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর, ৩ ফসলি জমিকে অনাবাধি দেখিয়ে ছাড়পত্র দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। এ রকম বৈধতা তো পুরোটাই অবৈধ। এ ব্যাপারে প্রশাসনের তদারকির অভাবে কৃষি জমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
রামগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাব্বির আহমেদ সিফাত জানান, কৃষি জমির টপ সয়েল কাটা এবং পুকুর খনন করা দন্ডনীয় অপরাধ। রামগঞ্জে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন কৃষি মাঠ থেকে টপসয়েল কাটা হচ্ছে এবং কেউ কেউ ফসলি জমি থেকে ১০ থেকে ১৫ ফুট গভীর করে মাটি নিয়ে যাচ্ছে। এতে প্রতি বছর অনাবাদি জমি বাড়ছে। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমরা মাসিক আইন শৃংখলা সভায় উপস্থাপন করে আসছি। প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তবে আমরা উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ঠিক রাখার জন্য আধুনিক জাতের বীজ ও কৃষি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদার করছি। রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাশিদ বিন এনাম জানান, টপসয়েল কাটা একটি ভয়াবহ কাজ। কোথাও ফসলি জমির টপসয়ের কাটার সংবাদ পেলে অভিযান পরিচালনা করা হয়। ইতিমধ্যে কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোথাও টপসয়েল কাটা অবস্থায় অপরাধিকে পাওয়া লেগে জেল দেয়া হবে। আর অপরাধি পাওয়া না গেলে নিয়মমিত মামলা দেয়া হবে। এ ব্যাপারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata